বৃহস্পতিবার দুপুর ১২:২৪ ১৬ই জুলাই, ২০২০ ইং ২৫শে জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী বর্ষাকাল
সাস্থ-চিকিৎসা

করোনাকাল ও হৃদরোগ

আপডেটঃ

করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিকে খুব সহজে পরাস্ত করতে পারে। ভাইরাসটি সাধারণত তার যাত্রা শুরু করে শ্বাসতন্ত্র প্রদােেহর মাধ্যমে। পরে পরিপাকতন্ত্র, হার্ট ও রক্ত সংবহনতন্ত্র, কিডনি এবং স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত করে বসে। গায়ে বেশ জ্বর কমতেই চায় না, অবর্ণনীয় দুর্বলতা, গলাব্যথা, শুষ্ক কাশি, শ্বাসকষ্ট; কখনো কখনো ডায়রিয়া কিংবা খিঁচুনি, বুকব্যথা অথবা অজ্ঞান হয়ে যায় অনেকে। যখন কোনো মানুষের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে, তখন সে ভাইরাসটি কোনো এক সময় হৃদযন্ত্র তাক করে বসে। মূল প্রবণতা থাকে হৃদযন্ত্রের ভেতরকার মাংসল অংশে পৌঁছে যাওয়া এবং সেখানে বিস্তার লাভ করা। ভাইরাসে সংক্রমণের ভয়াবহতা কতগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন-আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা শক্তিশালী, আক্রান্তজন অন্য কোনো রোগ, যেমন-ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হৃদরোগ, ক্যানসার জাতীয় কোনো রোগে আক্রান্ত কিনা। ক্যানসার বা অটোইমিউন রোগে হরহামেশাই এক ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যেগুলো মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দমিয়ে রাখে-সে রকম কোনো ওষুধ তিনি সেবন করছেন কিনা।

করোনা ভাইরাসও যথারীতি সূত্র মেনেই বোধ করি আর সব ভাইরাসের মতো হৃদযন্ত্রের সে মাংসল অংশের দিকে যাত্রা শুরু করে এবং সেখানে তীব্র প্রদাহের সৃষ্টি করে। ডাক্তারি পরিভাষায় যাবে বলে ভাইরাল মায়োকার্ডাইটিস। হৃদযন্ত্রের এ মাংসল স্তরটি যখন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন হৃদযন্ত্রের যে মৌলিক কাজ-রক্ত ও রক্তরস পাম্প করে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া, সেটি চরমভাবে বিঘ্নিত হয়ে পড়ে। আর হৃদযন্ত্রের মূল কাজই হলো শরীরের সর্বত্র বিশুদ্ধ রক্ত পৌঁছে দেওয়া। রক্ত ও প্রবহমান রক্তরস হচ্ছে শরীরের কোষকলার খাদ্য আর এ রক্ত পাম্প করে শরীরের বিভিন্ন কোষকলায় পৌঁছে দিতে হৃদযন্ত্রের থাকা চাই ন্যূনতম শক্তি। মায়োকার্ডাইটিসে আক্রান্ত হার্ট সে শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে অপর্যাপ্ত পুষ্টি ও অক্সিজেনের স্বল্পতা দেহের প্রধান অঙ্গগুলো, যেমন-কিডনি, মস্তিষ্ক, লিভার ইত্যাদি অকেজো হতে থাকে।

মায়োকার্ডাইটিস হওয়ায় হৃদযন্ত্রের বিদ্যুৎ সরবরাহও বিঘ্নিত হতে পারে। শুরু হয়ে যেতে পারে চরম অচলাবস্থা। হার্ট ব্লকের মতো মস্ত অসুখ। নিউমোনিয়া হচ্ছে ফুসফুসে সংক্রমণের গুরুতর ফল। হৃদযন্ত্রের দুপাশে অবস্থিত দুটো ফুসফুসের একটিও যদি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে হৃদযন্ত্রকে আর পায় কে! অমনি শুরু হয়ে যেতে পারে হৃদযন্ত্রে ছন্দহীনতা। বলে রাখা ভালো, স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের হৃদযন্ত্র চলতে থাকে এক ধরনের ছান্দিক দুলুনিতে। একদিকে হৃদযন্ত্রে ছন্দহীনতা, অন্যদিকে মায়োকার্ডাইটিসের কারণে পর্যাপ্ত রক্ত শরীরের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছাতে না পারা। ফলাফল হচ্ছে ফুসফুসে রক্ত ও রক্তরস জমে যাওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞান এ বিশেষ অবস্থার নাম দিয়েছে হার্ট ফেইলিউর।

আর যখন কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যায়, তখন সে খুব সহজে অন্য কোনো ব্যাকটেরিয়ায় সহজে আবার আক্রান্ত হয়ে পড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর নাম সেপটিসেমিয়া। এটি আবার হৃদযন্ত্রে হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম কারণ। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন এ ভাইরাসে আক্রান্ত না হয়ে পড়ি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস অথবা শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত, তারা প্রাত্যহিক ওষুধ সেবনে কোনো গাফিলতি করবেন না। ওষুধ সেবনের ক্ষেত্রে হৃদরোগী ও কিডনি রোগীর কোনো রকম শৈথিল্য মোটেও অভিপ্রেত নয়। খুব প্রয়োজন না হলে এ সময়ে হাসপাতালে না যাওয়া উত্তম। খুব সমস্যা হলে মোবাইলে সেরে ফেলার চেষ্টা করুন।

লেখক : প্রফেসর অব কার্ডিওলজি; বিভাগীয় প্রধান, হার্ট ফেইলিউর বিভাগ, বিএসএমএমইউ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close