সোমবার দুপুর ১:২০ ১৯শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ২রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি হেমন্তকাল
বিচিত্র-বিশ্ব

★ বাংলাদেশের সুন্দরবন ★ মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ্‌ দুলাল

আপডেটঃ সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

ইতিহাসঃ

প্রাচীনকাল থেকেই সুন্দরবনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায় সুন্দরবনের সৃষ্টি হয়। ‘Nicholas Paimenta’ নামীয় একজন মিশনারীর ভ্রমণ কাহিনীতেও সুন্দরবনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।
মোঘল আমল (১২০৩-১৫৩৮) থেকেই সুন্দরবনকে স্থানীয় রাজাদের নিকট পত্তন/ইজারা দেয়া হতো।
কালের বিবর্তনে বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ (Mangrove: গরান গাছ) বনকে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়। মুঘল সম্রাট আলমগীর-২ এর নিকট হতে ১৭৫৭ সনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উক্ত সুন্দরবনের স্বত্ব লাভ করে এবং ১৭৬৪ সনে সার্ভেয়ার জেনারেল কর্তৃক জরিপ পূর্বক মানচিত্র তৈরি করে।

বেঙ্গল বন বিভাগ (Forest Department in Bengal) স্থাপনের পর বন আইন-১৮৬৫ অনুযায়ী ১৮৭৫-১৮৭৬ সনে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৬৯ সনে সুন্দরবনকে জেলা প্রশাসনের নিকট হতে খুলনা শহরে নবসৃষ্ট বন ব্যবস্থাপনা বিভাগ এর নিকট ন্যস্ত করা হয় এবং ৬৯-৭৩ সনে সুন্দরবনে প্রথম জরিপ করা হয়। বাংলায় সুন্দরবন-এর আক্ষরিক অর্থ সুন্দর জঙ্গল বা সুন্দর বনভূমি।সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে, যা সেখানে প্রচুর জন্মায়। অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে যে, এর নামকরণ হয়তো হয়েছে “সমুদ্র বন” বা “চন্দ্র-বান্ধে (বাঁধে)” (প্রাচীন আদিবাসী) থেকে। তবে সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় যে সুন্দরী গাছ থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে।

সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম।গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা,
সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দুই জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জুড়ে বিস্তৃত।
সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় গরান বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে এবং বাকি অংশ রয়েছে ভারতের মধ্যে।
সুন্দরবনের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য ১৮৬৩ সাল হতে ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত  বহু ব্রিটিশ বন কর্মকর্তা সুন্দরবন পরিদর্শন করেন এবং সুন্দরবনকে সংরক্ষণ ও গাছ আহরণের বিষয়ে আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেন।

বাংলাদেশের অংশ ৬,০১৭ বর্গ কি.মি. আয়তনের সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ, দীর্ঘতম লবণাক্ত জলাভূমি এবং জীব বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেম (Eco System)। এখানে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিদ্যমান, যার মধ্যে আছে ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং সর্বোপরি বিশ্ব বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার (Royal  Bengal Tiger Panthera Tigris – Botanical Name), প্রধান সরীসৃপ জাতিগুলোর মধ্যে আছে নোনা পানির কুমির, অজগর, গোখরা, গুইসাপ, সামুদ্রিক সাপ, গিরগিটি, কচ্ছপ এবং অন্যান্য। প্রায় ৩০ অধিক প্রজাতির সাপ সুন্দরবনে পাওয়া যায়।

১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে।
পুরো পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ তিনটি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের একটি হিসেবে গঙ্গা অববাহিকায় অবস্থিত সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান যথেষ্ট জটিল। কারণ দুই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং ভারত জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশটি (৬২%) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর; পূর্বে বলেশ্বর নদী আর উত্তরে বেশি চাষ ঘনত্বের জমি বরাবর সীমানা। উঁচু এলাকায় নদীর প্রধান শাখাগুলো ছাড়া অন্যান্য জলধারাগুলো সর্বত্রই বেড়িবাঁধ ও নিচু জমি দ্বারা বহুলাংশে বাধাপ্রাপ্ত। প্রকৃতপক্ষে সুন্দরবনের আয়তন হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১৬,৭০০ বর্গ কি.মি. (২০০ বছর আগের হিসাবে)। কমতে কমতে এর বর্তমান আয়তন হয়েছে পূর্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান। বর্তমানে মোট ভূমির আয়তন ৪,১৪৩ বর্গ কি.মি. (বালুতট ৪২ বর্গ কি.মি.-এর আয়তনসহ) এবং নদী, খাঁড়ি ও খালসহ বাকি জলধারার আয়তন ১,৮৭৪ বর্গ কি.মি.। সুন্দরবনের নদীগুলো নোনা জল ও মিঠা জলের মিলন স্থান। সুতরাং গঙ্গা থেকে আসা নদীর মিঠা জল, বঙ্গোপসাগরের নোনা জল হয়ে ওঠার মধ্যবর্তী স্থান হলো এ এলাকাটি।

স্বাদুজলের জলাভূমির বনাঞ্চলঃ
সুন্দরবনের স্বাদুজল জলাভূমির বনাঞ্চল বাংলাদেশের ক্রান্তীয় আদ্র-সপুষ্পক বনের অন্তর্গত। এধরনের বন নোনাজলযুক্ত জলাভূমির উদাহরণ। স্বাদুজলের জীবমন্ডলের জলে সামান্য নোনা এবং বর্ষাকালে এই লবণাক্ততা কিছুটা হ্রাস পায়, বিশেষ করে যখন গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদের জলের কারণে নোনাজল দূর হয় এবং পলিমাটির পুরু আস্তরণ জমা হয়। এটি সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী অঞ্চল জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশে। অর্থাৎ বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে সুন্দরবন অবস্থিত। হাজার বছর ধরে বঙ্গোপসাগর বরাবর আন্তঃস্রোতীয় প্রবাহের দরুণ প্রাকৃতিকভাবে উপরিস্রোত থেকে পৃথক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!
Close
Close